টেলিফোন বুথ

Homeঅণুগল্প

টেলিফোন বুথ

এক.ঝড়ের রাত, দুর্যোগের সময়। লোডশেডিং এর কারণে পুরোপুরি অন্ধকার ছিলো চারপাশ। ঝড়-বাদলা থামবার অপেক্ষায় বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ভিজছিলাম ও বেশ। বাস স্ট্যান্ড, পাশেই একটা পরিত্যক্ত টেলিফোন বুথ। বেশ অনেক ক্ষণ যাবৎ একা একা দাঁড়িয়ে আছি । হঠাৎ ডানদিক থেকে কারো দৌড়ে আসার শব্দ পেলাম। বিজলির আলোয় দেখলাম, মাথায় ব্যাগ দিয়ে একজন দৌড়ে আসছে বাস স্ট্যান্ডের দিকেই। বুঝলাম, মেয়ে মানুষ। এই ঝড়ের রাতে একাকীত্ব বেশ লাগছিলো, তাই মনে মনে বিরক্তও হলাম। এই রাত বিরাতে মেয়ে মানুষ ঘরের বাইরে কি করে? কিন্তু সে কাছে আসতেই বিমূর্ত হয়ে গেলাম।দুই.এমন সময়টাতে, এইভাবে আবার দেখা হবে ভাবি নি। কখনো চাইওনি। না চাইতেই কত কিছু সৃষ্টিকর্তা আমাদের দেন, এই বুঝি তার প্রমাণ। অনেকদিন বাদে কতোকিছুই এখন চোখের সামনে ভেসে আসছে। কিছু স্মৃতি ঝাপসা, আবার কিছু একেবারেই উজ্জ্বল। আর কিছু না জানলেও এইটুকু জানতাম, সে আমাকে ভালোবাসতো, খুব ভালোবাসতো। কে জানে, হয়তো এখনো বাসে!এই কয়দিন যে তাকে একদম মনে করিনি তা নয়। মন চাইলেও তাকে মনে করেছি, না চাইলে আরো বেশি করে মনে করেছি। তবে দেখাটা হয়নি। শেষ তাকে দেখেছিলাম, তার বিয়েতে। কান্না জড়ানো চোখে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছিলো সে। কি যেন খুজছিলো খুব করে। জানি আমাকেই খুজছিলো। আমি কিন্তু একবারের জন্যেও তার সামনে যাইনি সেদিন। দূর থেকে দাঁড়িয়েই দেখেছি আমার স্বপ্নের হেরে যাওয়া। তার বিয়ের কয় বছর হলো ঠিক মনে নেই, ওর বাচ্চাকাচ্চা হয়েছে কিনা কে জানে? হলে দেখতে কেমন হয়েছে?বিজলি চমকাতেই দেখলাম, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, হাসছে। কতো কিছু পাল্টে গেলো, কিন্তু ওর হাসিটা কিন্তু আগের মতোই আছে। সাদামাটা, সুন্দর। বুঝলাম, এতোদিন বাদেও আমাকে সে একেবারে ভুলে যায়নি।তিন.চার বছর খুব করে প্রেম করেছিলাম আমরা। আমার কোনো ভালো চাকরি-বাকরি নেই, তাই বাসায় মানবে না এই জেনেও সে আমার সাথে পালাতে রাজি ছিলো।  কিন্তু আমার খুব বাধছিলো। ওই BCS এডমিন ক্যাডারের সাথে ঠিক হওয়া বিয়েটা আমি ভেঙে দেব? কিইবা যোগ্যতা আমার? বিয়ের পর কোথায় রাখব তাকে? খাওয়াবই বা কি? চার পয়সার কাগজে চার আনার চাকরি করি। সে কাগজ কেউ পড়েও না এখন। পরের মাসে বেতনটা পর্যন্ত এ কাগজ টিকবে কিনা তারও ঠিক ঠিকানা নেই। আর সেখানে কতো সুখে থাকবে সে। সরকারি ফ্ল্যাট, গাড়ি। তার এই সুখ কেড়ে নেবার অধিকার তো আর আমার নেই।তার বিয়ের দিন এসে পড়লো। তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে পুরোটা দেখি।না, আমি মানুষটা অতোটাও খারাপ নই।চার.অতো শত ভাবতে ভাবতেই বৃষ্টিটা কমে আসলো। বিদ্যুৎ চলে আসায় বাস স্ট্যান্ডের পাশের ল্যাম্প পোস্টে বাতি জ্বলে উঠলো। দেখলাম, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।খানিকক্ষণ পর নিরবতা ভেঙে সেই প্রথম বললো, “এতোদিন কোথায় ছিলেন? বিয়েটাও করেননি বোধহয়?”“এই গত বছর ডিসেম্বরেই করেছি।”, তাকে মিথ্যেটা বলতে বাধলো একদমই।কয়েক মুহুর্ত পর সে ব্যাগ থেকে একটা লাইটার বের করে আমাকে দিলো। “নিন, আপনার জিনিস। আপনি যাতে সিগারেট খেতে না পারেন, তাই নিয়েছিলাম আপনার পকেট থেকে। রঙটা জ্বলে গেলেও বেশ কাজ করে।” সেই কবে হারিয়ে যাওয়া আমার লাইটার। আমি শুধুই তাকিয়ে রইলাম।এতোক্ষণে বৃষ্টিটাও থেমে গেছে। দেখলাম, দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে সে। মানিব্যাগ বের করে তার ছবিটা দেখলাম, চেহারা অতোটা পাল্টায়নি। ছবিটায় হাত বুলালাম। নামের শেষে পদবীটা পাল্টে ফেললেও এখনো সে আমারই উর্মি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মানিব্যাগটা পকেটে ঢুকিয়ে আমিও হাঁটা শুরু করলাম।নিরব সাক্ষী হয়ে টেলিফোন বুথটা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। হয়তো, এরকম ঘটনা আগেও দেখেছে সে, হয়তো এই প্রথম।

Published by Online Income BD

I want to do something like Robinson Crusho.Want succeed by own work.If you want to walk with me, you can join with me

Leave a Reply

Create your own website, free on WordPress.com.Create your own website.
Start free